বায়ুর গতিবেগ (Wind Velocity)
বায়ুর গতিবেগের প্রধান নিয়ন্ত্রক বায়ুর চাপের ঢালজনিত বল। বায়ুর চাপ ঢাল যত বেশি হয়, বায়ুর গতিবেগ তত বাড়ে। অন্যদিকে ঢাল যত মৃদু হয় গতিবেগ তত হ্রাস পায়। তবে বায়ুর চাপ ঢালের সঙ্গেঙ্গ গতিবেগ সমানুপাতিক হলেও ভুপৃষ্ঠের ঘর্ষণজনিত বাধার কারণে উদ্ভূত ঘর্ষণজনিত বল বায়ুর গতিবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই কারণে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অংশে বায়ুর গতিবেগে তারতম্য লক্ষ করা যায়.
প্রদত্ত আবহাওয়া মানচিত্রে বিভিন্ন আবহাওয়াকেন্দ্রের বায়ুর গতিবেগ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে সংঘটিত পরিসংখ্যা তালিকা (Table: 1.2) ও এর ভিত্তিতে অঙ্কিত আয়তলেখ (চিত্র: 1.7) বিশ্লেষণ করলে অনুধাবন করা যায় যে সারা ভারত জুড়ে ঘণ্টায় ১ নট গতিবেগসম্পন্ন বায়ুপ্রবাহই প্রাধান্য বিস্তার করেছে। এর পরিসংখ্যান মোট আবহাওয়াকেন্দ্রের 28-89%। এ ছাড়া 21-11% এলাকায় ঘণ্টায় 5 নটের চেয়ে কম, 14-44% এলাকায় 10 নট, 6.67% এলাকায় 15 নট গতিবেগে বায়ু প্রবাহিত হয়েছে। 20 ও 25 নট গতিবেগে বায়ু খুবই কম এলাকায় প্রবাহিত হয়েছে। এদের পরিমাণ উভয় এলাকাতেই মোট আবহাওয়াকেন্দ্রের 26-67% এলাকাতেই শান্তভাব বিরাজ করে.
উল্লিখিত বায়ুপ্রবাহের গতিবেগের তালিকা ও আবহাওয়া মানচিত্র বিশ্লেষণ করে সমগ্র ভারতবর্ষকে নিম্নলিখিত বায়ুপ্রবাহ অঞ্চলে ভাগ করা যায়। এগুলি হল-
(ক) শান্ত বায়ুপ্রবাহ অঞ্চল (Calm Zone):
• প্রভাবিত এলাকা: উত্তরবঙ্গসহ সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারত জুড়ে এই শান্ত বায়ুপ্রবাহ বলয়ের বিস্তার। মোট ভূভাগের প্রায় 25-30 অংশ জুড়ে এই বলয় বিস্তৃত।
• সৃষ্টির কারণ: মূলত বায়ুর চাপ ঢাল খুবই সামান্য হওয়ায় বায়ুপ্রবাহ গতিবেগ হারায় বলে এই বলয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
(খ) হালকা বায়ুপ্রবাহ অঞ্চল (Light Breeze Zone) ঘণ্টায় 5 নট বা তার কম গতিবেগসম্পন্ন বায়ুপ্রবাহ যুক্ত অঞ্চল উক্ত বলয়ের অন্তর্ভুক্ত।
• প্রভাবিত এলাকা: এই বলয়টি সমগ্র উত্তর ভারত, মধ্য গাঙ্গেয় অববাহিকা, মধ্যপ্রদেশের অধিকাংশ স্থান, সমগ্র মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তেলঙ্গানা, কেরল, ছত্তিশগড় ও ওড়িশার দক্ষিণ অংশে বিস্তৃত। গোদাবরী মোহনা বাদে সমগ্র মালাবার উপকূল এবং মধ্য আন্দামানও এই বায়ু প্রবাহ অঞ্চলের মধ্যে বিস্তৃত।
সৃষ্টির কারণ: বায়ুচাপ ঢাল মাঝারি থেকে খাড়া হওয়ায় এই সমস্ত অঞ্চলে বায়ুর গতিবেগ কিছুটা বেশি।বৃদ্ধি পেয়েছে।
(গ) মৃদু বায়ুপ্রবাহ অঞ্চল (Genite Breeze Zone)' যে-সমস্ত অঞ্চলে বায়ুর গতিবেগ ঘণ্টায় 10 নট সেই অঞ্চলগুলি এই বায়ুপ্রবাহ বলয়ের অন্তর্গত।
প্রভাবিত এলাকা: পূর্ব রাজস্থানের কিছুটা আশ, ওড়িশা, অত্মপ্রদেশ, তামিলনাড়ু ও ছত্তিশগড়ের মধ্যভাগ এবং উত্তর আন্দামান জুড়ে এই বলয়টি বিস্তার লাভ করেছে।
• সৃষ্টির কারণ: প্রধানত মৃদু থেকে খাড়া বায়ুর চাপ ঢাল ও সমুদ্র উপকূলের সান্নিধ্যের কারণে কম ঘর্ষণজনিত বাধার প্রভাবে উক্ত অঞ্চলে মৃদু বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হয়েছে। মোট ভূভাগের 7-10% এলাকা এই বলয়ের অন্তর্গত।
(ঘ) মধ্যম প্রকৃতির বায়ুপ্রবাহ অনুদা (Moderate Breeza Zone): ঘন্টায় 15 নট গতি সম্পন্ন বায়ুপ্রবাহের এলাকাকে মধ্যম প্রকৃতির বায়ুপ্রবাহ অঞ্চল বলা হয়।
• প্রভাবিত এলাকা: দক্ষিণ গুজরাটের কচ্ছ ও খাম্বাত উপসাগরের মধ্যবর্তী ভূভাগ, রাজস্থানের মরুসস্থলী এবং লাক্ষাদ্বীপ ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এই বায়ুপ্রবাহ বলয়ের অন্তর্গত।
• সৃষ্টির কারণ: ঘর্ষণজনিত বাধার অনুপস্থিতি, উন্মুক্ত সমুদ্রের উপস্থিতিতে ফেড় (fetch) বেশি থাকায় মৃদু বায়ুর চাপ ঢাল থাকা সত্ত্বেও এই অঞ্চলে বায়ুর গতিবেগ বেশ বেশি।
(ঙ) তেজী বায়ুপ্রবাহ অ (Strong Breeze Zone) ঘণ্টায় 20 নট বা তার বেশি গতি সম্পন্ন বায়ুপ্রবাহ যুক্ত এলাকাই এই বলয়ের অন্তর্ভুক্ত।
প্রভাবিত এলাকা:শুধুমাত্র মধ্যপ্রদেশের পশ্চিম ভাগে এই বলয়টি অবস্থান করছে।
• সৃষ্টির কারণ: মধ্যপ্রদেশে সৃষ্টি হওয়া গভীর নিম্নচাপের প্রভাবে সৃষ্ট কেন্দ্রমুখী বল ও তীব্র বায়ুর চাপ। ঢালজনিত কারণে এই বলয়টির সৃষ্টি হয়েছে।