গ্রিনহাউস প্রভাব (Green House Effect)
বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, নাইট্রোজেন অক্সাইড, ক্লোরোফ্লুরোকার্বন, জলীয় বাষ্প ইত্যাদি গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত ঘনত্ব বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলে এদের সম্মিলিত প্রভাবে চাঁদোয়ার (Canopy) মতো একটি গ্যাসীয় আবরণ সৃষ্টি হয়েছে। এই আবরণের প্রভাবে ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত দীর্ঘ তরঙ্গোর আলোকরশ্মি মহাশূন্যে ফিরে না-গিয়ে শোষিত হয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করছে। ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ঘটনাকেই গ্রিনহাউস প্রভাব বলে। বিখ্যাত আবহবিদ ব্যারি (Barry) এবং চোরলে (Chorley)-র মত অনুযায়ী, ক্ষুদ্র তরঙ্গের সৌর বিকিরণের ক্ষেত্রে বায়ুমন্ডলের স্বচ্ছধর্মিতার সাপেক্ষে, পার্থিব দীর্ঘ তরঙ্গোর অবলোহিত বিকিরণের ক্ষেত্রে বায়ুমণ্ডলের অস্বচ্ছধর্মিতাকে গ্রিনহাউস প্রভাব বলে।"
প্রধান প্রধান গ্রিনহাউস গ্যাস ও তাদের উৎস (Major Green house gasses and their sources)
বায়ুমন্ডলের যে সমস্ত গ্যাসের তাপ শোষণ ও সংরক্ষণের ক্ষমতা আছে তাদের গ্রিনহাউস গ্যাস বলে। কার্বন ডাইঅক্সাইড হল প্রধান গ্রিনহাউস গ্যাস। এ ছাড়া মিথেন, ওজোন, ক্লোরোফ্লুরো কার্বন, নাইট্রাস অক্সাইড, জলীয় বাষ্প প্রভৃতিকেও গ্রিনহাউস গ্যাস বলা হয়।
গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধির কারণ (Causes of increasing of Green House gases)
1. জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি: বিভিন্ন জীবাশ্ম জ্বালানি, যথা-কয়লা, পেট্রোলিয়াম প্রভৃতি হাইড্রোকার্বন জাতীয় যৌগ দহনে বায়ুতে কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড মেশে। মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশে শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে কলকারখানা ও যানবাহন চালাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ক্রমশ বেড়ে চলেছে। ফলে বায়ুতে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণও বাড়ছে।
2.অবাধে বৃক্ষচ্ছেদন: স্বাভাবিক উদ্ভিদই একমাত্র প্রাকৃতিক সম্পদ যা বায়ুমণ্ডলের CO,-কে শোষণ করে এবং ৩, মুক্ত করে। কিন্তু কৃষিকাজ, বাসস্থান নির্মাণ, নগরের সম্প্রসারণ, জ্বালানি কাঠের প্রয়োজনীয়তা প্রভৃতি কারণে অবাধে বৃক্ষচ্ছেদন করে বনভূমি নিধন করা হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বায়ুমণ্ডলে CO₂-এর পরিমাণ বাড়ছে।
3. ক্লোরোফ্লুরোকার্বনের ব্যবহার: রেফ্রিজারেটার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র, ইলেকট্রনিক্স শিল্পে এবং রং উৎপাদনে প্রচুর পরিমাণে CFC ব্যবহৃত হয়। এগুলি পরে বায়ুমণ্ডলে মিশে পরিবেশে CFC-এর পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি করছে।
4. নাইট্রোজেন সারের অতিরিক্ত প্রয়োগ: কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তথা জমির উর্বরাশক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচুর নাইট্রোজেনঘটিত রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। এই রাসায়নিক সার নাইট্রেট ও পরে বায়ুর অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে নাইট্রাস অক্সাইডবুপে বায়ুমণ্ডলে মিশছে।
5. জৈব অবশিষ্টাংশের পচন: বিভিন্ন ধরনের জৈব পদার্থ বা আবর্জনার পচনের ফলে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হচ্ছে, যা বায়ুতে মিশে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলছে।
6. অন্যান্য কারণ: উপরিউক্ত বিষয়গুলি ছাড়াও ওজোন গ্যাসের ধ্বংসের কারণে বায়ুমণ্ডলের উত্তাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া উত্তাপ বৃদ্ধির ফলে বিশ্বে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে এবং বায়ুতে জলীয় বাষ্পের ধারণক্ষমতা বাড়ছে। এই কারণে বায়ুতে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই জলীয় বাষ্পও উদ্বুতার অন্যতম শোষক।
গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধির ফলাফল (Effects of increase of Green house gas)
বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পৃথিবীর উদ্বুতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও মানুষসহ সমস্ত জীবমণ্ডলের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে.
1.পৃথিবীর গড় উন্নতা বৃদ্ধি: বায়ুতে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধির ফলে ভূপৃষ্ঠ থেকে বিকিরিত উত্তাপ মহাশূন্যে ফিরে না গিয়ে এই গ্যাসগুলি দ্বারা শোষিত হয় এবং বায়ুমণ্ডলের উন্নতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এতে পৃথিবীর উত্তাপের সমতা বিঘ্নিত হয় এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গড় উন্নতা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, শিল্প বিপ্লব থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পৃথিবীর গড় উষ্ণতা 1.5° সে: বৃদ্ধি পেয়েছে।
2. জলবায়ুর পরিবর্তন : পৃথিবীর গড় উদ্বুতা বৃদ্ধির ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে।যেমন- (1) ক্রান্তীয় মন্ডলের দেশগুলিতে গ্রীষ্মকালের দৈর্ঘ্য বাড়ছে এবং শীতকাল প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। (ii) উচ্চ অক্ষাংশের মেরু সন্নিহিত দেশগুলিতে শীতকালীন উন্নতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শীতকালের স্থায়িত্ব কমছে। (iii) পৃথিবী জুড়ে ঘূর্ণিঝড়, বজ্রঝঞ্ঝার মতো বায়ুমন্ডলীয় গোলযোগ এবং খরা, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
3. বরফ ও হিমবাহের গলন : বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বন্ধি পাওয়ায় মেরু অঞ্চলের বরফ, ভাসমান হিমশৈল পার্বত্য উপত্যকার হিমবাহ গলতে শুরু করেছে। এর ফলে হিমবাহের পশ্চাদপসারণ ঘটছে ও হিমরেখার উচ্চতা বাড়ছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমালয়ের অমরনাথে বরফের শিবলিঙ্গের উচ্চতা ক্রমশ কমে আসছে।
4. সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি: গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে মেরু ও পার্বত্য অঞ্চলে বরফ বেশিমাত্রায় গলতে শুরু করায় সমুদ্রের জলতলের গড় উচ্চতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর গড় উন্নতা 1.5° সেঃ বৃদ্ধি পাওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় 10-12 সেমি বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের আশঙ্কা এভাবে বিশ্ব উন্নায়ন চললে এই শতাব্দীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় 50-60 সেমি বৃদ্ধি পাবে। এর প্রভাবে সমুদ্র উপকূলবর্তী নিম্নভূমি জলপ্লাবিত হয়ে পড়বে, নদীতে জলের লবণতা বৃদ্ধি পাবে। ম্যানগ্রোভ বনভূমি ধ্বংস হয়ে বন্যপ্রাণীর বিনাশ ঘটবে।
5. সমুদ্রজলের উদ্বুতা বৃদ্ধি: বিশ্ব উন্নায়নের ফলে সমুদ্র জলের গড় উন্নতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস শোষণের পরিমাণ কমছে। ফলে সামুদ্রিক উদ্ভিদ কার্বন ডাইঅক্সাইডের অভাবে মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া জলের উন্নতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিভিন্ন সামুদ্রিক কীটসহ বহু জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব বিপন্ন হচ্ছে। ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হচ্ছে।
6. জলচক্রের পরিবর্তন: বিশ্ব উন্নায়নের প্রভাবে বারিমণ্ডল, বায়ুমণ্ডল ও শিলামণ্ডলের মধ্যে জলের চক্রাকার আবর্তন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে- (i) পৃথিবী জুড়ে বৃষ্টিপাত অনিয়মিত হয়ে পড়বে। কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও অনাবৃষ্টি দেখা দেবে। ফলে বন্যা ও খরার প্রাদুর্ভাব ঘটবে। (ii) বাষ্পীভবনের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও পার্বত্য অঞ্চলে তুষারপাত বৃদ্ধি পাবে।
7. কৃষিতে পরিবর্তন: গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে পৃথিবীর উন্নতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিকভাবে কৃষিকাজেও পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাবে হিমালয়ের কুলু উপত্যকায় আপেল চাষের পরিবর্তে বর্তমানে পেঁয়াজ ও - রসুনের চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া গ্রিনহাউসের প্রভাবে- (i) গম, বার্লি, ওট, সয়াবিন, তামাক, তুলো, পাট ইত্যাদির উৎপাদন কমেছে। (ii) জমিতে আগাছা বৃদ্ধি ও ফসলে পোকামাকড়ের আক্রান্তের হার বেড়েছে। (iii) সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ভবিষ্যৎ-এ কৃষিজমির পরিমাণ কমবে।
৪. জীববৈচিত্র্য হ্রাস: বিশ্ব উন্নায়নের জন্য বহু উদ্ভিদ ও প্রাণী চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গবেষক ডেনিস মার্কি-র পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে বায়ুমণ্ডলের গড় উন্নতা 3° সেঃ বৃদ্ধি পেলে 40% স্তন্যপায়ী প্রজাতি এবং বেশ কিছু পাখি চিরতরে বিলুপ্ত হবে।
9. উদ্ভিদের ওপর প্রভাব: উন্নতা বৃদ্ধির ফলে উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার পরিবর্তন ঘটবে এবং বর্ধিত উন্নতার সঙ্গে অভিযোজন না-করতে পারায় বহু উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্ত হবে।
10. রোগের প্রাদুর্ভাব : গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে উন্নতা বৃদ্ধি পেলে হৃদরোগ, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, পীতজ্বর এবং বিভিন্ন ভাইরাসঘটিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়বে।
প্রিনহাউস প্রভাব নিয়ন্ত্রণের উপায়সমূহ (Measures of controlling Green house effect)
প্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে রিও-ডি-জেনিরো, জোহানেস্বার্থ ও সম্প্রতি জাপানের কিয়েটো শহরে পরিবেশ-সংক্রান্ত সম্মেলনে বিভিন্ন প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবগুলিতে যে সমস্ত পদ্ধতি অবলম্বনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে সেগুলি নিচে আলোচনা করা হল-
1. জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস: শক্তি উৎপাদনে বিভিন্ন জীবাশ্ম জ্বালানির উৎস (কয়লা, খনিজ তেল) যথাসম্ভব কম ব্যবহার করলে বাতাসে CO, -এর পরিমাণ হ্রাস পাবে।
2. অপ্রচলিত শক্তির অধিক ব্যবহার: জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বিভিন্ন অপ্রচলিত শক্তি, যেমন- সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, ভূতাপীয় শক্তি, জোয়ারভাটা শক্তি প্রভৃতির ব্যবহার বৃদ্ধি করলে বায়ুতে CD, এর পরিমাণ কমবে। উপরন্তু এসব শক্তির উৎসগুলি পরিবেশবান্ধব।
3. ফ্রেয়ন গ্যাসের উৎপাদন বন্ধ: শিল্পে বিভিন্ন ফ্রেয়ন গ্যাসের (CFC,, এবং CFC) উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
4. বনসৃজন: গাছকাটা বন্ধ করে পর্যাপ্ত পরিমাণে বনসৃজনের দিকে নজর দিতে হবে। কারণ একমাত্র সবুজ উদ্ভিদই পারে সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় বায়ুমণ্ডলের CO, শোষণ করে বায়ুমণ্ডলে এর পরিমাণ কমাতে।
5. প্রযুক্তিগত উন্নতি: পরিবহণে ও শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত ইঞ্জিনের ক্ষমতা বাড়িয়ে পেট্রোল, ডিজেল প্রভৃতি জ্বালানির অপচয় ও ব্যবহার কমানো যেতে পারে। ফলে বায়ুতে CO, কম পরিমাণে মিশবে।
৬. আবর্জনা প্রক্রিয়াকরণ: জৈব এবং অজৈব বর্জ্যকে আলাদা করে জৈব বর্জ্যের সঠিক প্রক্রিয়াকরণ করতে পারলে মিথেন উৎপাদন কমে আসবে।
7. পরিবর্ত ও বিকল্প দ্রব্যের ব্যবহার : জ্বালানি হিসেবে কাঠের পরিবর্তে সোলার কুকার, মাইক্রোওয়েভ ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করলে গ্রিনহাউস প্রভাব অনেকটাই কমবে।
৪. জনসচেতনতা বৃদ্ধি: জনসাধারণকে গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। এর সঙ্গে দৈনন্দিন কাজে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন বন্ধ হয়ে যাবে সে ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
9. গবেষণায় উৎসাহদান: গ্রিনহাউস গ্যাস, বিশ্ব উন্নায়ন, জলবায়ুর পরিবর্তন ইত্যাদি পরিবেশবিষয়ক গবেষণায় সরকারের পক্ষ থেকে উৎসাহ প্রদান করতে হবে