welcome to mygeo.in Indian no 1 geography based website in Bengali

ভারতবর্ষ ( India)

 ভূমিকা (introduction)


 

ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক দিক থেকে আমাদের মাতৃভূমি ভারত একটি মহান দেশ। এর আয়তন এতই বিশাল যে একে অনেক সময় ‘উপমহাদেশ' আখ্যা দেওয়া হয়। এটি এশিয়া মহাদেশের অংশ। কিন্তু অনেক সময় ভারতকেই একটি মহাদেশ বলে মনে হয়। এটি বরফাবৃত হিমালয় থেকে ভারত মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত। ভারত মহাসাগর গঙ্গার ব-দ্বীপ থেকে গুজরাটের কচ্ছ ও সিন্ধু উপত্যকার পূর্বাংশ পর্যন্ত হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। উত্তরের বিশাল সমভূমি, পশ্চিমে ঘরের মরুভূমি, পূর্বের ইন্দো- মায়ানমার পার্বত্যভূমি, বন্ধুর মালভূমি, প্রাচীন পার্বত্যভূমি, দক্ষিণের নারকেল উৎপাদনকারী উপকূলীয় সমভূমি এবং উত্তরের উঁচু বরফাবৃত পর্বতমালা এই ভূমির অন্তর্ভুক্ত। ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত বলে এখানে সূর্যতাপ বেশী। মৌসুমী বৃষ্টিপাত এই অঞ্চলের আর্দ্রতা বাড়িয়ে তুলেছে। প্রচণ্ড সূর্যতাপ ও প্রচুর মৌসুমী বৃষ্টিপাত লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে যথেষ্ট প্রভাবিত করে চলেছে। এই আমাদের ভারতবর্ষ, আমাদের ভাগ্য অধিষ্ঠাত্রী।


 কবি গুরুর  ভাষায় -

অয়ি ভুবনমনোমোহিনী, মা

অগ্নি নির্মলসূর্যকরোজ্জ্বল ধরণী জনকজননিজননী।।


নীলসিন্ধু জলধৌতচরণতল, অনিলবিকম্পিত-শ্যামল-অঞ্চল, অম্বচুস্থিতভালহিমাচল, শুভ্রতুষারকিরীটিনী।। “ভারত” কথাটি এসেছে গ্রীক শব্দ ইন্দোই (Indoi) থেকে – ইন্দোস নদীর কাছাকাছি ভূমিভাগ। রোমানরা এই নদীর নাম উচ্চারণ করত ইন্দাস বলে এবং এর পরের দেশ হল ভারত। পারসিকরা এই নদীর নামকরণ করেছিল হিন্দু (সিন্ধুকে হিন্দু বলতো) এবং এর পূর্বদিকের দেশ হল হিন্দুস্তান।

প্রাচীন রাজা ভরতের নামে এই দেশের নামকরণ হয়েছে ভারত বলে। ঋকবেদে ভরত নামে আর্য জাতির এক শক্তিশালী রাজার উল্লেখ পাই। ঐতরের ব্রাহ্মণে (Aitareya Brahmana) ভরতের রাজ্যাভিষেক, অশ্বমেধ যজ্ঞ ইত্যাদির উল্লেখ পাই। ভগবত পুরানে তাঁকে অধিরথ এবং সম্রাট (রাজার রাজা) বলা হয়েছে। তিনি আর্যকরণ প্রক্রিয়া তরান্বিত করেছিলেন। প্রাচীন উপাখ্যান অনুযায়ী ভরত ছিলেন দুষ্মন্তের ছেলে। এই ভরতের নামে ভারত নামকরণ হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে পুরাণে প্রথম আমরা ভারত নামটির সাথে পরিচিত হই। বিষ্ণু পুরাণের মতে মহাসাগরের (ভারত মহাসাগরের) উত্তর দিকের ভূখণ্ড এবং হিমালয়ের দক্ষিণদিকের ভূখণ্ড ভারত নামে পরিচিত। এখানকার এই এলাকাটি ভারতের বংশধর "ভারতী"দের বসবাসস্থল।


উত্তরং যৎ সমুদ্রস্য, হিমাশ্বে হিমাদ্রেশ্চৈব দক্ষিণম্।

বর্ষ তদ্ ভারতং নাম ভারতী যত্র সংততিঃ।। (বিষ্ণুপুরাণ)

বৌদ্ধ যুগে এই দেশটি অম্বুদীপ (Jambudwipa) নামে পরিচিত ছিল। বৈদিক যুগে মধ্যদেশ (পাঞ্জাব ও পশ্চিম উত্তর প্রদেশ) বলতে বোঝাত আর্য রাজ্য, আর প্রাচ্য (পূর্ব দেশ) বলতে অনার্য রাজত্ব মগধ ও বিদেহকে বোঝাত। পরবর্তীকালে মধ্যদেশ ও প্রাচ্য শব্দ দুটির বদলে ব্রহ্মোত্তর ও আর্যাবর্ত কথা দুটি ব্যবহার করা হত। আর্যাবর্ত (আর্যদের দেশ) বলতে হিমালয় ও বিন্ধ্য পর্বতের মধ্যের অংশকে বোঝাত। আর এর দক্ষিণের অংশ (কৃষ্ণা নদী পর্যন্ত) দক্ষিণাপথ। আর্যাবর্ত বলতে কাশ্মীর থেকে কেপ ক্যামেরুন পর্যন্ত দেশকে বোঝানো হত যা ভারত বা ইণ্ডিয়ার আর এক নাম।


•প্রাকৃতিক পরিবেশ ও আমরা


সময়ের বিবর্তনের দিকে তাকালে একটি পরিবর্তনের রূপরেখা পরিলক্ষিত হয়। জঙ্গলে বসবাসকারী প্রস্তর যুগের খাদ্যসংগ্রাহকরা প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল ছিল। তারা ভীত ও কুণ্ঠিত জীবনযাপন করত। প্রাচীন নব-প্রস্তর (নিওলিথিক) সম্প্রদায় পৃথিবী-মাকে পূজা করে তাদের নিজেদের তৈরী পাথরের লাঙল দিয়ে মাটি চাষ করত। তারা প্রচুর উদ্ভিদ ও বৈচিত্র্যময় প্রাণী সম্পদের অধিকারী হয়েছিল এবং এইভাবেই জীবনধারণ করত। শক্তিশালী আর্যরা প্রকৃতির শক্তির প্রতি প্রশংসামূলক গীত রচনা করত। কিন্তু একই সময়ে নদীকে নিয়ন্ত্রণ করে ও আকারহীন মাটিকে আকৃতি দিয়ে প্রকৃতির শক্তিকে নিয়ন্ত্রন করতেও শিখেছিল। প্রত্যেক বছর পলিক্ষেপনকারী নদীর উর্বর তীরে বড় ও ছোটো গ্রামগুলিতে এই প্রাচীন কৃষক সম্প্রদায় বাস করত এবং প্রশান্ত চিত্তে গঙ্গা, যমুনা ও কাবেরীর তটে ক্রমশঃ বিস্তৃত শহরগুলিতে সাম্রাজ্যের উত্থান পতন লক্ষ্য করত। এই বিশাল জনসাগরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী নিয়ে গঠিত দ্বীপের মতো শহর রয়েছে। অন্ধকার ও অপরিচ্ছন্ন কর্মশালায় শ্রমিক ও হস্তশিল্পীরা মৃত পাথরে জীবনদান করে, চকচকে সোনা থেকে গয়না তৈরী করে এবং বর্ণময় সুতি ও রেশমী সুতো দিয়ে কাপড় বোনে।

অন্যদিকে আবার সেই বিবর্তনের আরেকটি নতুন রূপ দেখা যায়। চিমনি থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। আকরিক থেকে পাওয়া গলিত তামাটে ধাতু স্টীলে রূপান্তরিত হচ্ছে। প্রচণ্ড জলপ্রবাহের শক্তিকে বশ মানানো হচ্ছে।


সময়ের অলিগলি দিয়ে যাত্রার এই প্রতিটি স্তরে আমরা ধীরে ধীরে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছি। প্রথম দিকে আমরা প্রায় প্রকৃতির দাস ছিলাম। আস্তে আস্তে কিন্তু ক্রমাগত আমরা প্রকৃতিকে বুঝতে ও এর সঙ্গে সহযোগিতা করতে শিখেছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রভূত জ্ঞানের সাহায্যে প্রকৃতির সাথে আমাদের যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধুমাত্র আমাদের বোধগম্য প্রকৃতির সঙ্গেই আমরা যোগাযোগ করতে পেরেছি। আমরা এর বিরোধিতা বা উপেক্ষা করতে পারি না, কারণ আমরা এর সন্তান। আমরা প্রকৃতির কোলেই লালিত পালিত হই এবং আমাদের অস্তিত্ব এর উপর নির্ভরশীল। আমাদের উন্নতির দিশা প্রকৃতি-প্রদত্ত সুযোগ সুবিধার দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবিত হয়। উন্নতির কাঠামোটাই প্রকৃতি তৈরী করে। শ্রেষ্ঠ ফল লাভে প্রকৃতিই আমাদের নির্দেশক। এক নতুন দিগন্তের সূচনার স্বার্থে আমাদের এই নিয়মকে মান্য করা উচিত।

যুক্তিসঙ্গত উপায়ে আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার করতে জানতে হবে। লোভবশত একে তাড়াতাড়ি অপচয় করলে চলবে না। আবার বহুল পরিমানে এই প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে পতিত জমি সৃষ্টি করাও উচিত নয়। প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী ও যুক্তি সঙ্গতভাবে এই প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করা উচিত। আগামী প্রজন্মের জন্য এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে। আমাদের এটা বুঝতে হবে যে আমরা এর ব্যবহার কর্তা মাত্র, অধিকর্তা নই।


স্থানীয় সম্পর্ক

ভূ-গোলকে আমরা দেখতে পাই, ভারতীয় উপমহাদেশ মূল এশিয়া ভূখণ্ডের দক্ষিণের বর্ধিত অংশ মাত্র। ভারতীয় উপদ্বীপ ভারত মহাসাগরে এমনভাবেই বিস্তৃত হয়েছে যে এটি এই মহাসাগরকে আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর নামে দুটি জলভাগে ভাগ করেছে (চিত্র )। এই দুই সাগর যথাক্রমে ভারতের পশ্চিম ও পূর্ব উপকূলে বিস্তৃত এবং সংলগ্ন অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য বিশাল মৎস্যক্ষেত্রও তৈরী করেছে। ভারতের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী আফ্রিকা, দক্ষিণ পশ্চিম ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সম্পর্ক নির্ধারণ করতে এই দুই সাগর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কোনো কোনো সময় ভারত এবং এশিয়ার উপদ্বীপসমূহ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপপুঞ্জ, পশ্চিম এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যে উপরোক্ত দুই সাগর সহজ যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। আবার অন্য সময়ে এই জলভাগই মানুষের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতা ও বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জল পথে যোগাযোগের মাধ্যমে সুদূর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দেশগুলির প্রভাব ভারতীয় সংস্কৃতিতে পরেছে। সমুদ্রপথে আগত এই প্রতিবেশী দেশগুলির প্রভাব ও তাদের নিত্য নতুন সাংস্কৃতিক উপাদানসমূহ ভারতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। অন্যদিকে, আবার এই সমুদ্রই কিছুটা বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করেছে যা ভারতীয় সভ্যতার স্বকীয়তা গড়ে তুলেছে।


উত্তরের হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত নিরবিচ্ছিন্ন পর্বতশৃঙ্খল বাস্তবিকই ভারত ও হিমালয়-উত্তর (Trans- Himalayas) এশিয়ার মধ্যে প্রাচীর তৈরী করেছে। এই অলঙ্ঘনীয় পর্বত-শৃঙ্খলের জন্যই উত্তরপূর্ব ও উত্তর পশ্চিম দিক দিয়ে ভারতে প্রবেশ করা কঠিন হয়েছে। ফলত তিব্বত, পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ শুধুমাত্র উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থিত কতগুলি গিরিপথের (Pass) দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যই ভারতকে আংশিকভাবে আবদ্ধ উপনিবেশ হিসেবে সৃষ্টি করেছে। আবার এদেশের জনগনের মধ্যে স্বকীয়তা ও ঐক্য বৃদ্ধি করেছে।


ভারত পৃথিবীর একটি বড় অংশ অধিকার করে আছে। প্রায় 32.8 লক্ষ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত ভারত পৃথিবীর বিশালাকার দেশগুলির অন্যতম। কিন্তু ভারতের থেকেও অনেক বড় দেশ রয়েছে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রই ভারতের (98.3 লক্ষ বর্গ কি.মি.) থেকে প্রায় তিনগুণ বড়।


ভারত উত্তর গোলার্ধে অবস্থিত। এই উপদ্বীপের দক্ষিণতম বিন্দু নিরক্ষরেখা থেকে মাত্র কয়েক ডিগ্রী উত্তরে রয়েছে (চিত্র)। কর্কটক্রান্তি রেখা এই দেশের প্রায় মাঝামাঝি দিয়ে গেছে। ভারতের উত্তরতম অংশে হিমালয় পর্বতমালা রয়েছে। এই পর্বতগুলির উৎপত্তি এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পৃথিবীর ছাদ পামীর গ্রন্থি থেকে হয়েছে। ভারতীয়

দক্ষিণতম প্রান্তে রয়েছে উষ্ণ ও আর্দ্র কন্যাকুমারী যা ক্রমাগতঃ সরু হতে হতে সাগরে মিলিয়ে গেছে। কেউ যদি ভারতের মূল ভূ-খণ্ডের উত্তরতম বিন্দু থেকে দক্ষিণতম বিন্দু পর্যন্ত ভ্রমণ করে তাহলে সে 3,200 কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করবে। এই সুরার প্রায় 30° অক্ষাংশীয় বিস্তারের সমান যা নিরক্ষরেখা থেকে উত্তর মেরু পর্যন্ত অক্ষাংশীয় বিস্তারের এক তৃতীয়াংশ। উত্তর দক্ষিণের মতো ভারতের পূর্ব পশ্চিমেও এর বিস্তৃতি প্রায় 3000 কিলোমিটার, এর পশ্চিমতম প্রান্ত কচ্ছের রাণের নোনা খাঁড়ি ও জলমগ্ন নীচু অঞ্চলে অবস্থিত। অন্যদিকে, যেখানে মায়ানমার, চীন ও ভারত মিলিত হয়েছে এবং  যেখানে প্রাগৈতিহাসিক ঐতিহ্যমণ্ডিত সুপ্ত পাহাড় ও বন রয়েছে সেখানে ভারতের পূর্বতম প্রাত্ত অবস্থিত। পূর্ব-পশ্চিমে ভারতের দ্রাঘিমাগত বিস্তার প্রায় 30° যা স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানী, বেলজিয়াম নেদারল্যাণ্ড ও পোল্যাণ্ডের দ্রাঘিমাগত বিস্তারের সমান এবং যা নিরক্ষরেখায় পৃথিবীর পরিধির বারো ভাগের এক ভাগ। যখন অরুণাচল প্রদেশে সূর্য উঠে গেছে তখনও সৌরাষ্ট্রে রাত্রি থাকে। কিন্তু মাত্র দু ঘন্টা পরেই কাথিয়াবাড়ের চাষী ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে ও প্রভাত সূর্যকে স্বাগত জানায়।


সুতরাং, আমাদের মাতৃভূমি বিশাল ও ব্যাপক, যদিও এই জেট যুগে দূরত্ব তার পূর্ব তাৎপর্য হারিয়েছে। প্লেনে একই দিকে গেলে কেউ শ্রীনগরে প্রাতরাশ ও তিরুবনন্তপুরমে দুপুরের খাবার খেতে পারে, আর হিন্দী সিনেমার তিন ঘন্টা সময়ের মধ্যেই সে জামনগর থেকে গুয়াহাটি যেতে পারে।


•ভারত ও প্রাচ্য পৃথিবী

প্রাচ্যের মানচিত্রের দিকে একবার তাকানো যাক। ভারত মহাসাগর আফ্রিকার পূর্ব উপকূল ও এশিয়ার দক্ষিণ উপকূলে বিস্তৃত। প্রাচীনকালে এই মহাসাগরে ব্যবিলনীয়, মিশরীয় ও ফিনিশীয়দের তরনী ভেসে বেড়াত। এই সামুদ্রিক পথেই আরব বণিকরা তাদের ব্যবসা করত। ভারতীয় নৌকা ও জাহাজগুলি অন্ততঃ চার হাজার বছর ধরে এই সাগরে চলাচল করছে। এরা ইউফ্রেটিস, টাইগ্রিস ও নীলনদের উপত্যকায় বাণিজ্য সামগ্রী ছাড়াও বালিতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারণা এবং কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় ভাস্কর্য বহন করে নিয়ে গেছে।


ভারত মহাসাগরই পূর্ব আফ্রিকা, পশ্চিম এশিয়া এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া দ্বারা গঠিত এই প্রাচ্য পৃথিবীকে একত্রিত করেছে। সুয়েজ খাল কাটার মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে দক্ষিণ ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকাতেও আমাদের প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।


ভারত মহাসাগরে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে ভারতবর্ষ। ভারত মহাসাগর সংলগ্ন অন্য কোনো দেশের ভারতের মত এত বিস্তৃত উপকূলরেখা নেই। দাক্ষিণাত্য উপদ্বীপ ভারত মহাসাগরে এমনভাবে অবস্থিত যে ভারতের পশ্চিম উপকুল থেকে পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ এবং পূর্ব উপকূল থেকে দক্ষিণ পূর্ব ও সুদূর পূর্ব পর্যন্ত দুই দিকেই যোগাযোগ রাখা যায়। শ্রীলঙ্কা ছাড়া অন্যান্য দেশগুলি ভারত মহাসাগরের সীমানায় রয়েছে। এই জন্য ভারত মহাসাগর প্রকৃত অর্থেই ভারতীয়।

সমুদ্র অনেক পরে যোগাযোগের মাধ্যম হয়েছে। বরং সভ্যতার সূচনা থেকে স্থলভাগই স্থানীয় যোগাযোগের মাধ্যম ছিল। একে বোঝার জন্য ভারতের মানচিত্র লক্ষ্য করা যাক। ভারতের উত্তর ও উত্তর  পশ্চিম দিকে হিমালয় পর্বত দুর্গের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মনে হয় যে এই প্রায় অবিচ্ছেদ্য পর্বতমালা আমাদেরকে উত্তরের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। কিন্তু এটা একটা ভুল ধারণা মাত্র। সবুজ, বাদামী ও ঘন বাদামী রঙের এই প্রাকৃতিক মানচিত্র আমাদের অনেক সময় ভুল পথে চালিত করে। পর্বত বায়ুর প্রবাহকে প্রতিহত করে। কিন্তু মানুষ গিরিখাত, নদী উপত্যকা ও গিরিপথের মাধ্যমে খোলাপথ খুঁজে পেয়েছে। বহু সংস্কারক ও সৈন্যগণ তথা শিল্পী ও হস্তশিল্পীরা এই পথেই যাতায়াত করেছে। বিচ্ছিন্ন উঁচু শৃঙ্গগুলিকে অতিক্রম না করেই দলে দলে যাযাবর চাষীর দল এই খোলা পথে ভারতের উর্বর উপত্যকাতে প্রবেশ করেছে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এই পথে তিব্বতে গেছে। তারপর সেখান থেকে তারা চীন, কোরিয়া ও জাপানে শান্তির বার্তা নিয়ে গেছে। ম্যাসিডোনিয়ার রাজপুত্র ভারতে তাঁর সৈন্যবাহিনী এনেছিলেন। তাদের সঙ্গে গ্রীক স্থাপত্য এদেশে আসে। ভারতীয় ব্যবসায়ীরা তাদের বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে এই বিশাল উচ্চতা অতিক্রম করেছিল এবং মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। এরা পঞ্চতন্ত্রের গল্পও নিয়ে গিয়েছিল। মোঙ্গল, তুর্কী, আরবীয় ও ইরানীরা ভারতবর্ষ জয় করতে এসেছিল, কিন্তু তারা এখানে এসে তাদের বসতি স্থাপন করে। কবির ভাষায় – হেথায় আৰ্য, হেথা অনার্য হেথায় দ্রাবিড় চীন...... দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে। মোঘলরা তাদের সঙ্গে গম্বুজ ও মিনারের ঐতিহ্য আনে এবং ভারতবর্ষ থেকে নিয়ে গেছে সংখ্যাপদ্ধতি, দশমিক পদ্ধতি ও উপনিষদের ধ্যান-ধারণা সমূহ। আমাদের দেশ প্রাচীন ও মধ্যযুগের প্রধান সড়কপথের কাছে অবস্থিত বলেই এই সমস্ত ধারণা ও দ্রব্যের আদান প্রদান সম্ভব হয়েছিল।

পূর্ব, পশ্চিম, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারতবর্ষ যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। আমরা শুধুমাত্র নিজেদের দেশ সম্বন্ধে আগ্রহী নই। সংকীর্ণ স্থানীয় ভেদে বিভক্ত পৃথিবীতে আমরা বাস করি না। আমরা মানবিক সম্পর্কের উন্নতি ও বিভিন্ন দেশকে একত্রিত করার কাজে নিয়োজিত।


• ভারতের প্রতিবেশীসমূহ


প্রাচীন সভ্যতার অন্যান্য দেশগুলির মতো ভারতের সীমানাও মূলতঃ প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত। ভারত মহাসাগরের প্রান্তীয় সাগরগুলি ভারতের দক্ষিণ সীমানা রচনা করেছে এবং একে প্রায় পৃথিবীর ব্যাসের সমান বিস্তৃত উপকূলরেখা। দিয়েছে। নিউইয়র্ক থেকে সানফ্রানসিকো পর্যন্ত ভ্রমণ করলে প্রায় সম দূরত্ব অতিক্রম করা হয়। এই সমুদ্র ভারতের মূল ভূ-খণ্ড থেকে বেশ কিছু দ্বীপপুঞ্জকে পৃথক করেছে—যেমন, বঙ্গোপসাগরে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ও আরব সাগরে লাক্ষা দ্বীপপুঞ্জ। সমুদ্রে ভারতের নিকটতম প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা। অপ্রশস্ত পক প্রণালী এই দৃশ দেশকে বিচ্ছিন্ন করেছে। ভারত ও বঙ্গোপসাগরের পূর্ব সীমান্তে রয়েছে মায়ানমার, মায়নমার, মালয়েশিয়া,ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যাণ্ড, কাম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনাম। পশ্চিম সীমান্তে রয়েছে পাকিস্তান, ইরান, ইরাক ও আরব দেশসমূহ। ভারত মহাসাগরের সুদূর পশ্চিমে রয়েছে মিশর, সুদান, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া, কেনিয়া ও তান্‌জানিয়া। লাক্ষাদ্বীপের দক্ষিণে মালদ্বীপ অবস্থিত (চিত্র)।

হিমালয় পর্বতমালা আমাদের উত্তর সীমানাকে রক্ষা করছে। পর্বতমালার সীমানা ধরে চীনের তারিম উপত্যকায় সিংকিয়াহ (ঝিজিয়াং) অঞ্চল রয়েছে যেখানে একদা প্রাচীন কাশগড় (কাশিন) ও খোটান (হোতেইন) সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। পশ্চিমে সিংকিয়াং ও আফগানিস্তানের ওয়াখান অঞ্চল দ্বারা ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন তাজিকিস্থান অবস্থিত। এই অঞ্চলে ভারতের দক্ষিণে রয়েছে কঠোর, স্বাধীনতাপ্রেমী পাঠানদের রাষ্ট্র। এই প্রেক্ষাপটে বিচার করলে ভারতীয় ত্রিভুজের উত্তর প্রান্তের যথেষ্ট কূটনৈতিক তাৎপর্য আছে। এখানে এশিয়ার পাঁচটি দেশ মিলিত হয়েছেঃ চিন (ঝিনজিয়াং), উজবেকিস্তান, আফগানিস্থান, পাকিস্থান ও ভারত। ভারতের উত্তর ও পূর্ব সীমান্তে পবিত্র কৈলাস ও মানস সরোবরের ভূমি তিব্বত অবস্থিত। রাজনৈতিকভাবে চীন প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত তিব্বতের সাথে ভারতের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক যোগসূত্রের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আমাদের উত্তরে নেপাল অবস্থিত। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক দিক থেকে ভারত ও নেপালের মিল আছে। অনেক রাস্তা ভারত ও কাঠমান্ডুর মধ্যে সংযোগ রক্ষা করছে। কোশী নদীকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো কাজ এই দুই দেশের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার বন্ধনকে দৃঢ় করেছে। আমাদের উত্তর পূর্ব সীমায় অবস্থিত ভুটান প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। ভারত ও ভুটান বিশেষ সূত্রে আবদ্ধ। ভূটানের পূর্ব দিকে উচ্চ হিমালয়ের পর্বতসমূহ ভারত ও চীনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। ম্যাকমোহন রেখার এই সীমানা ধরে তিব্বত অবস্থিত। এর রাজধানী লাসা ভারতীয় সীমানার 300 কি.মি.-এর মধ্যে অবস্থিত। ঘন বনভূমি ও জটিল পার্বত্য অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় সীমানা আরও পূর্বদিকে বিস্তৃত হয়েছে। এখানেই সেই অঞ্চল অবস্থিত যেখানে মায়ানমার, ভারত ও চীন মিলিত হয়েছে। ভারতের পূর্ব সীমানা হিমালয় পর্বতমালার অপেক্ষাকৃত নীচু শৃঙ্গগুলির দ্বারা নির্দিষ্ট। মিশমি, পাটকাই ও নাগা পর্বতের প্রায় নিরবিচ্ছিন্ন শৃংখল আমাদের পূর্ব সীমানাকে রক্ষা করছে। তাদের পাশে বারালি শৈলশ্রেণী, লুসাই পাহাড় ও আরকোন স্লোমা অবস্থিত। ঘন ক্রান্তীয় বনভূমি দ্বারা আবৃত এই শৈলশ্রেণি ধরেই ভারত ও মায়ানমারের সীমানা বিস্তৃত। মায়ানমারের মাঝখানে অবস্থিত মান্দালয় আমাদের পূর্ব সীমানা থেকে 300 কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে।


আমাদের উত্তর ও পূর্বের প্রতিবেশীদের থেকে বিচ্ছিন্নকারী এই পর্বতগুলির প্রকৃতি এতই জটিল যে অতীতে এর মাধ্যমে ব্যাপক যোগাযোগ সম্ভব ছিল না। অবশ্যই সেখানে কিছু পথ ছিল যার মাধ্যমে তীর্থযাত্রীরা কৈলাস ও মানস সরোবরে যেত। তবে গত শতকেই বর্তমান যোগাযোগের মাধ্যম তৈরী হয়েছে। শতদ্রু গিরিখাত দিয়ে ঐতিহাসিক হিন্দুস্থান-তিব্বত সড়কপথ বিস্তৃত হয়েছে। উঁচু শৃঙ্গগুলিকে অতিক্রম করার জন্য কারাকোরাম গিরিপথ দিয়ে কাশ্মীর-বেল। সড়কপথ উত্তরে বিস্তৃত হয়েছে। সিকিমের একটি গিরিপথ যাতায়াতের তৃতীয় প্রধান রাস্তা। বায়ু পরিবহনের উন্নতির ফলে পর্বতের এই অলঙ্ক বাধা কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে। ইতিহাসে এই প্রথম আমাদের উত্তরের সীমানা জীবিত হয়ে উঠেছে। হিমালয়ের যে রহস্য শুধুমাত্র সন্ন্যাসী ও ভবঘুরে পর্যটকদের আকর্ষণ করত তা আজ রাজনৈতিক, কূটনীতিক ও দক্ষ সেনাবাহিনীর আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।


1947 সালে দেশভাগের পর ভারতীয় উপমহাদেশের নতুন রাজনৈতিক মানচিত্র তৈরী হয়েছে (চিত্র)। এর পূর্বাংশে পূর্ব পাকিস্তান গড়ে উঠেছে। যদিও 1971 সালে এটি পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র গঠন করেছে। বাংলাদেশের সীমানায় পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং মিজোরাম এই রাজ্যগুলি অবস্থিত। আমাদের পশ্চিম সীমানায় অবস্থিত পাকিস্থানের সাথে রাজস্থানের কালিবাজান, পাঞ্জাবের হরপ্পা ও সিন্ধুর মহেঞ্জোদাড়ো অঞ্চলের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। এছাড়া, ভারতের উত্তরে রয়েছে কঠোর পরিশ্রমী পাঠানদের বাসস্থান। এর দক্ষিণে রয়েছে পঞ্চ নদীর দেশ যেখানে অমৃতসর ও জলন্ধরের গ্রামের মতো সোনালী গমের ক্ষেতে হার ও ভাঙরার সুর শোনা যায়। আরও দক্ষিণে পশ্চিমে রাজস্থানের মরুভূমি (Thar) অবস্থিত। এর পাশেই রয়েছে সিন্ধু অঞ্চল যা সিন্ধু ব-দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত।


আমরা ঐতিহ্যগতভাবে শান্তিপ্রিয় মানুষ। ভারতীয় সেনাবাহিনী খুব কমই অন্য দেশের মাটিতে পা দিয়েছে। কাম্বোডিয়ার ভারতীয় মন্দির, চীনের মঠে বৌদ্ধ পাণ্ডুলিপি ও মধ্য এশিয়ার প্রাচীন শহর থেকে উদ্ধারীকৃত বস্তু থেকে প্রাচীন ভারতীয় বাণিজ্যিক দ্রব্য সম্বন্ধে ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন। কিন্তু কোথাও তাঁরা ভারতীয় জয়যাত্রার স্মারক খুঁজে পাননি। ভারতীয় ইতিহাস হল সেইসব জনগনের ইতিহাস যারা তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে শাস্তিতে বসবাস করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আমরা স্বাধীনতা ভালোবাসি যা আমরা এক শক্তিশালী ঔপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে কষ্ট করে অর্জন করেছি। আমরা এই স্বাধীনতাকে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে রক্ষা করতে ভালোবাসি।

• ভারতের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব (Geopolitical Importance of India )


আধুনিক ধারণা অনুসারে ভূ-রাজনীতি বলতে বোঝায় গতিশীল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা এবং তার বিশ্লেষণ সম্পর্কিত একটি জটিল পদ্ধতি যা সমগ্র বিশ্বের মধ্যে একক রাষ্ট্র অপেক্ষা অধিক বিস্তৃত ক্ষেত্র নিয়ে কার্যকরী। একটি রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব ও গঠন মূলতঃ নির্ভরশীল এই গতিশীল প্রক্রিয়ার সঠিক কার্যকারিতার ওপর, যে প্রক্রিয়া কতকগুলি নীতি দ্বারা পরিচালিত। সাধারণভাবে একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে অপর একটি রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব অবশ্যম্ভাবী এবং একদিকে দ্বন্দু ও অপরদিকে সহযোগিতা এর মাধ্যমে তৈরী হয় আন্তর্জাতিক নীতি যা পরোক্ষভাবে জাতীয়তা বোধের উন্মেষ ঘটায়, বিকাশ ঘটায় রাজনৈতিক চেতনার। এইভাবেই যুগ যুগ ধরে ধীরে ধীরে কিংবা দ্রুতগতিতে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক শক্তির প্রযুক্তিগত ও ভাবধারাগত বিশ্লেষণ পরিবর্তিত হয়। তবে পরিবর্তনের ধরণ বিভিন্ন সময়ে নানা প্রকার হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশ স্বাধীনতার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উভয় সময়ে অবস্থানগত বৈশিষ্ট্য দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রাজনৈতিক দৃশ্যাবলীতে বহু পট পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তিত হচ্ছে জনগনের রাজনৈতিক ধারণা। পরিবর্তনের এই ক্রমবিবর্তন সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও রাজ্যে রাজনৈতিক দিগক থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। ভারতীয় ভূরাজনীতির প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থান, সীমারেখা, ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের গঠন, অভ্যন্তরীণ শাসননীতি, বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক, পররাষ্ট্রনীতি, ভারতীয় গণপ্রজাতান্ত্রিক মতাদর্শ প্রত্যেকটি পৃথক পৃথকভাবে গুরুত্বের দাবী রাখে।


• ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভূ-রাজনীতিতে এর প্রভাব :

ভারত বা ভারতীয় উপমহাদেশ হলো দূর প্রাচ্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে অবস্থিত এমন একটি দেশ যা মূলতঃ অবস্থানগত কারণে ভূ-রাজনীতির ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। অবস্থানগত কারণে ভারত কতকগুলি বিপজ্জনক অঞ্চলের সংগে সংযোগ সাধন করে অবস্থান করছে। এই উপমহাদেশের আকৃতি ত্রিভুজের মত; যার দক্ষিণে রয়েছে দাক্ষিণাত্যের মালভূমি বা উপদ্বীপিয় অঞ্চল, উত্তরে হিমালয় এবং তরাই ও ডুয়ার্সের সুবিস্তৃত জঙ্গল, পশ্চিমে মরুভূমি, পূর্বে পার্বত্য ভূমি প্রভৃতি। এসবই বিভিন্ন দিক থেকে ভারতীয় ভূরাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে। কারণ এই প্রতিটি বিভাগই তাদের স্বীয় অবস্থান দ্বারা কতকগুলি সুচিহ্নিত সীমান্ত প্রদেশের সৃষ্টি করেছে এবং ভারতীয় ভূ-প্রকৃতিতে সৃষ্টি করেছে এমন কিছু উর্বর ভূমিভাগ যার ঊর্ধ্বরতা সুপ্রাচীনকাল থেকে এখনও পর্যন্ত শত্রু-মিত্র সকলকেই এদেশে আসতে প্রলুব্ধ করেছে। এইভাবে ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুর প্রকৃতি যা বহুলাংশে অবস্থান এবং ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা প্রভাবিত তা এই উপমহাদেশের সীমা নির্ধারণ, দেশের অভ্যন্তরস্থ ও জাতির মধ্যে আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্ক নির্ধারণ, ব্যবসা বাণিজ্য ও সম্পদের বণ্টন প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়কে প্রভাবিত করে ভূ-রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে।

11

প্রকৃতপক্ষে, ভারতের রাজনৈতিক চিত্রটি অত্যন্ত জটিল। পশ্চিমী ভাবধারার উপর ভিত্তি করে ভারতে তৈরি হয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকার। কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে এটি সম্পূর্ণভাবে পশ্চিমী আদর্শের নীতিতে পরিচালিত নয়। পরন্তু গঠনতান্ত্রিক দিক থেকে ভারতীয় শাসননীতি যুক্তরাষ্ট্রীয় হলেও কার্যতঃ তা এককেন্দ্রিক। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ক্ষমতা এবং রাষ্ট্র ক্ষমতার পৃথকীকরণ সত্ত্বেও কেন্দ্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আধিকারিত্বের দ্বারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বা সম্পূর্ণভাবে ভারতের শাসনতান্ত্রিক ক্রিয়াকলাপকে নিয়ন্ত্রণ করে, যাকে এক বাক্যে বলা হয়: “India's political structure is federal in concept but unitary in functioning. ' ভারতীয় প্রজাতন্ত্র দ্বি-জাতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে ধর্মীয় ধারণার সূত্র ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু তবুও সম্পূর্ণভাবে একে হিন্দু রাষ্ট্র বলা যায় না। কারণ ভারতের আর্থ-সামাজিক গঠন কমিউনিজমের উপযোগী হলেও, এই পদ্ধতি ভারতের সাধারণ মানুষের খুব বেশি পছন্দ হয়নি। ভারতীয় শাসনতান্ত্রিক নীতি অতীতে যে সমস্ত জাতি ও দেশ ভারতের জনগণকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছে, অত্যাচার করেছে—তাদের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। পৃথিবীর সমগ্র জনবসতির প্রায় এক ষষ্ঠাংশ (1/6th) জনসংখ্যা সমৃদ্ধ এই ভারত হল পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী আসন লাভ করবার জন্য ভারতকে বহু লড়াই করতে হয়েছে। ভারতের মধ্যে এশিয়া অথবা অ্যাফ্রো-এশিয়ার উপর ক্ষমতা বিস্তারে সুপ্ত ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ভারত কখনই ক্ষমতা দখলের লড়াইতে নিজেকে সামিল করেনি। বরং দক্ষিণ এশিয়ার বাইরে নিজের ক্ষমতার বাহু প্রসারে শাসনতান্ত্রিক রাশ টেনে ধরেছে। এইভাবে ভৌগোলিক অবস্থান, বিভিন্ন প্রচলিত মতবিরোধ বা আত্মবিরোধী অথচ সত্য বিভিন্ন ঘটনাবলী ও কার্যপ্রক্রিয়া ভারতের ভূ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে পরীক্ষামূলক নীতি গ্রহণ করে এগিয়ে যাবার পথে সহযোগিতা করেছে এবং ভারতের রাজনৈতিক পুনর্গঠনও তার রাজ্য, ভাষা, ধর্ম, চেতনা এবং বৌদ্ধিক প্রয়াস ভারতীয় ভূ-রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহন করেছে।


• ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান এবং ভূ-রাজনীতিতে এর প্রভাব : ভারতের উত্থাপনের ইতিহাস 5000 বছরেরও পুরনো, অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতারও আগেকার। অতঃপর নানা ঘটনাক্রমের মধ্যে দিয়ে 1947 সালে ভারত স্বাধীন হয়। 1947 সাল পর্যন্ত বা ভারত স্বাধীন হবার পূর্ব পর্যন্ত ভারত গণতান্ত্রিক দেশ ছিল না। 1950 সালের সাংবিধানিক পরিবর্তন ও নীতি গ্রহণের পর থেকে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একের পর এক সাফল্য ভারতকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছে। ভারত বর্তমানে ভিন্ন ভাষাভাষী, ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও ভিন্ন সংস্কৃতি বিশিষ্ট মানুষের সমাবেশে পূর্ণ যারা নিজ নিজ বাসভূমিকেই নিজস্ব ভূমি বলে বিবেচনা করে এবং এভাবেই গড়ে উঠেছে তার ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। একটি বৈশিষ্ট্য হল বিকেন্দ্রীকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের গঠন, যেখানে কেন্দ্রাতিগ শক্তি অধিক ক্রিয়াশীল হয়ে। থাকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে বৃহৎ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র ভেঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হতে দেখা যায়, যার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হল ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ আমলে ভারত এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল। পরে ভারতে বিভিন্ন স্বতন্ত্র অঙ্গরাজ্য সমূহ জন্মলাভ করে এবং অঞ্চলগুলি একে অপরের সংগে সাংবিধানিক সূত্র ধরে মিলিত হয়ে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র গঠন করে। যদিও ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র কথাটি আমরা ব্যবহার করি, সংবিধানে কিন্তু একে বলা হয়েছে Union of States বা রাজ্যসমূহের সংযুক্তিকরণ; সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বা Federation of States কথাটি ব্যবহৃত হয়নি। আসলে সংবিধান স্থপতিরা মনে করেছিলেন ভারত ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল— “আমরা যদি কেন্দ্রকে দুর্বল করি আমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত হব' (We perish if we make the centre weak) । তাই N. Srinivasan ও স্বীকার করেছেন ভারতীয় সংবিধান ছিল— “Noticeably Centripetal"। তাই এই জন্য আমরা দেখতে পাই ভারতীয় সংবিধান 355 356 ধারা প্রয়োগ করে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে। তবে কেন ভারতীয় সংবিধানে যুক্তরাষ্ট্র (Federation of States) এর পরিবর্তে রাজ্যের সংযুক্তিকরণ (Union of States) কথাটি ব্যবহৃত হয়েছিল—এই উত্তরে বি. আর. আম্বেদকর বলেছেন, ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোন রাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার অধিকার (Rights to seccde) স্বীকৃত হবে না। সুতরাং বিষয়টি বিতর্কিতই থেকে গেছে।

ভারতের ভূ-রাজনীতি – সীমানা অঞ্চল এবং ভারতের প্রশাসনিক কাঠামো (Geopolitics with special ref- erence to border states & administrative setting of India) :


ভারতের সীমানা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলঃ এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত ভারত এক সুবিশাল দেশ। সীমানা বলতে ভারতের পূর্বে বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে পাকিস্তান ও আরব সাগর, উত্তরে চীন প্রজাতন্ত্র, আফগানিস্তান ও নেপাল, আর দক্ষিণে শ্রীলঙ্কা ও ভারত মহাসাগর, ভারতের উত্তর ও পূর্ব সীমান্ত প্রদেশে বাংলাদেশ ব্যতিত পর্বতবেষ্টিত মায়ানমার, দক্ষিণ সীমান্তে বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগর। এই বিচারে ভারতের সীমারেখা মূলত প্রাকৃতিক। ব্যতিক্রম শুধু পূর্বে বাংলাদেশ ও মায়ানমার এবং পশ্চিমে পাকিস্তানের সীমারেখা যা দেশ বিভাগের ফলে নির্ধারিত হয়। এই সীমারেখাটি রাজনৈতিক।


ভারতের 15,200 কি.মি. দীর্ঘ অঞ্চল জুনে রয়েছে স্থল সীমানা। যে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের উঃ পঃ এবং উঃ পূঃ


দিক বেষ্টন করে রয়েছে সুউচ্চ হিমালয় পর্বতশ্রেণী। হিমালয় পর্বতমালা তার ভূমিরূপগত এবং অবস্থানগত বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করেছে ভারত ও চীনের মধ্যে প্রাকৃতিক সীমারেখা। অন্য দিকে উঃ পশ্চিমে জম্মু ও কাশ্মীর, উত্তরে চীনের সিকিয়াং এবং ভারত ও তিব্বতের মধ্যেও আন্তর্জাতিক সীমানা নির্ধারণের মাধ্যম হিসেবেও হিমালয় চিহ্নিত। উত্তরে নেপালের বাফার রাষ্ট্রের অবস্থান এবং ভূটানের পূর্ব দিক উচ্চ শৈলশিরা যা ম্যাকমোহন লাইন হিসেবে পরিচিত তা ভারত ও চীনের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমারেখা নির্ধারণ করেছে।


অন্যদিকে পশ্চিমে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি হওয়ায় তা সর্বক্ষেত্রে সন্তোষজনক হয়নি। কারণ এই ধরনের আন্তর্জাতিক সীমানার অধিকাংশ ক্ষেত্রে সীমানার দুই দিকের পরিবহন ও যোগাযোগের এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবার ক্ষেত্রে একই ধরনের হওয়ার ফলে, অর্থাৎ ভারত ও পাকিস্তানের ভাগ হাজার আগে অবিভক্ত পাঞ্জাব রাজ্যের জৈব, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক ইত্যাদি বিষয়ে যথেষ্ট একতা ছিল কিন্তু বিভক্ত হওয়ার পর পাঞ্জাব রাজ্যের কিছু অংশ যায় ভারত ও কিছু অংশ যায় পাকিস্থানে। কিন্তু এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সহধর্মিতা সীমানা নির্ধারণে সহায়তা করে না বলেই আরম্ভ হয় ভারত কাশ্মীর সীমানা অঞ্চলের বিবাদ।


ভারতের পূর্বদিকের সীমানা নির্দেশ করে অবস্থান করেছে হিমালয় পর্বতের শাখাটি যা পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে প্রসারিত হয়ে অরুণাচল রাজ্যের পূর্ব সীমান্তে এক বিরাট বাঁক নিয়ে উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত হয়ে ভারত মায়ানমারের মধ্যে প্রাকৃতিক সীমানা নির্ধারণ করেছে। এখানে অবস্থিত পর্বতগুলির মধ্যে প্রধান হল পাটকই, নাগা, লুসাই, আরকানওয়ামা প্রভৃতি পর্বতশ্রেণী। এই আরাকান য়োমা পর্বতশ্রেণী দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তলদেশে প্রবেশ করে আরও দক্ষিণে কিছুটা উত্থিত হয়েসৃষ্টি করেছে আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের।

পূর্বদিকে অন্য সীমানাটি সম্পূর্ণভাবেই রাজনৈতিক। কারণ পূর্বদিকে অবস্থিত বাংলাদেশের একদিকে অবস্থিত রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সীমান মধ্যে অবস্থিত রয়েছে একটি সমভূমি যা প্রকৃতপক্ষে গহগা ব্রহ্মপুত্রের মিলিত উপত্যকা। বাংলাদেশের উত্তরের সীমানায় কোনো বিশাল পর্বতের অবস্থান না থাকার দরুন এই রাজনৈতিক সীমার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মানুষের অবাধ চলাচল ভারত বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বৃ রাজনীতি, ভূমি-রণকৌশলের মধ্যে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছে।


ভারতের অন্য সীমানা নির্ধারণ করে রয়েছে বিশাল বিশাল সমুদ্র, মহাসমুদ্র। এই সমুদ্রবেষ্টিত ভারতের উপকূল রেখার ভৌগোলিক আয়তন 6100 কি.মি। অবস্থানের বিচারে দক্ষিণে রয়েছে ভারত মহাসাগর, পূর্বে বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে আরব সাগর বিস্তৃত রয়েছে প্রাকৃতিক সীমানা হিসেবে। ঐতিহাসিক কাল হতে ভারতের এই জল সীমানা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে আবার এই পথ ধরেই ব্রিটিশরা ভারতে আসে বাণিজ্যিক কারণে। বর্তমানে ভারতের নৌ পরিবহন ব্যবস্থা প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক বেশী উন্নত বলে এই জল সীমানা অনেক সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।


ভারতের প্রধান সীমানাগুলি ছাড়া আরো যে সীমানা অঞ্চলের অবস্থান দেখা যায় তা হল গিরিপথ। এই গিরিপথগুলি রয়েছে হিমালয় পর্বতের মধ্যে। এগুলির মধ্যে বিখ্যাত পথগুলি হল জম্মু ও কাশ্মীরের পিরপঞ্চল ও হিমাচল প্রদেশে রোটাং গিরিপথ। এছাড়া শ্রীনগর ও জম্মুর মধ্যে সংযোগরক্ষাকারী জহওর সুড়ঙ্গ, জোজিলা সুড়ঙ্গ, নাথুলা সুড়ঙ্গ সংযোগ রক্ষা করে চলেছে চীন ও সিকিমের মধ্য দিয়ে ভারতের সঙ্গে। হিমাচলপ্রদেশের শিকিলা, বফরগড়া ও বাচাংপাণ ইত্যাদি নানা গিরিপথ এবং সুড়ঙ্গগুলি ভারতের সঙ্গে হিমালয় পর্বতের বাধা দূর করে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে চলেছে।

উপরে বর্ণিত সীমান্ত অঞ্চলগুলি ছাড়া এখন ভারতের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মধ্যে যে আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে সেগুলি নিয়ে ভিন্নভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন।


• ভারতের আন্তর্জাতিক     সীমানাসমূহ :


1. ভারত-চীন সীমানা (The Indo- China Border) : ভারত চীন সীমান্ত অঞ্চল নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সীমানা বিতর্ক এমনই তুঙ্গে উঠে যায় যে 1962 তে চীন ভারত আক্রমণ করে। এই আক্রমণ করার কারণগুলি মধ্যে 

(a) চীনের অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে তাদের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে যারা নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করেছিল এবং যে সকল অঞ্চল একদা চীনা রাজতন্ত্রের অধীনে ছিল সেই অঞ্চলগুলিকে চীন কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে আনার জন্য এই যুদ্ধের প্রয়াস বলে ঘোষণা করে।


(b) দ্রুত চীনের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বাসস্থানের চাহিদায় এই আক্রমণ।


(c) আকশি চীনের মধ্য দিয়ে একটি রাস্তা তৈরীর ক্ষেত্রে কিছু অঞ্চল দখলের প্রয়োজন হয়, কারণ রণনীতিগত কারণেও এই রাস্তা তৈরীর প্রয়োজন।

(d) দুই দেশের ভাবাদর্শের মধ্যেও যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কারণ ভারতে রয়েছে গণতান্ত্রিক এবং জোট নিরপেক্ষ সরকার, অন্যদিকে চীনে রয়েছে গোষ্ঠীতন্ত্র যুক্ত সাম্যবাদী (কমিউনিস্ট) জোটবদ্ধ একনায়কতন্ত্র রাজ।

 (e) ভারত তিব্বতের দলাইলামাকে সহায়তা করত এবং নানাভাবে শিল্প সংস্কৃতি বা অস্ত্র দিয়েও সহায়তা করত।


উপরে বর্ণিত রাজনৈতিক কারণগুলি ছাড়াও ভারতের উত্তরের সীমানা অঞ্চলের এক বিরাট অংশ ঐ সময় চীনের অংশ বলে চীন দাবী করে। 1992 সালে সান ইয়েটসান মানচিত্র অঙ্কন করেন এবং ভারতীয় রাজ্যের 1,32,000 বর্গ কি.মি. অঞ্চল দাবী করেন এবং 1962 সালে যুদ্ধের পর ভারতের বিশাল অংশ চীন অধিকার করে। দেখা গেছে যে চীন যা দাবী করেছিল তার অনেক বেশী অংশই চীন তার অধিকারে নিয়ে নেয়। পরবর্তী সময়ে নানা আলোচনার মধ্যে দিয়ে দুই রাজ্যের সীমানা নির্ধারণের সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা চলে। ম্যাকমোহন লাইনকে ভারতের দিকে সীমানা বলে মেনে নিতে চীন অস্বীকার করে, ফলে ঐ ব্যাপারে সমস্যা থেকেই গেছে। 3.440 কি.মি. দীর্ঘ সীমান্ত নিয়ে বরাবর বিতর্ক ছিল এবং এখন অমীমাংসিত। দুই দেশের মধ্যে নিয়ন্ত্রণরেখা থাকলেও তা অসম্পর্ক যেমন

1976 সালে মানুষ ও চো-নায় সংঘর্ষ

1987 সালে অরুণাচল সীমান্তে সংঘাত

2017 সালে ডোকানমের কাছে (ভুটান সীমান্তে) ভারতের একটি রাস্তা তৈরি করাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা

2020 সালের 15 জুন রাতে লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা সংলগ্ন গামতয়ান উপতাকা নিরস্ত্র ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর চীন সৈন্যদের আক্রমণ, পরিনামে 20 জন ভারতীয় সেনা হত হয়।

2. পাকিস্থানের সীমানা (The Pa kistan Boundary) : ভারত পাকিস্থানের সীমারেখাটি কচ্ছের রণ অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে রাজস্থান, পাঞ্জাব এবং জম্মু ও কাশ্মীরের মধ্য দিয়ে চলে গেছে। Radcliffe এই সীমানারেখাটি স্থলভাগের মধ্য দিয়ে নির্ধারণ করেন। এক্ষেত্রে কচ্ছেররণ অঞ্চল জলাভূমি অঞ্চল হেতু সেভাবে বিভক্ত করা হয় নি বলে পাকিস্থান দাবী করে এবং আরও দাবী করে যে ঐ অঞ্চলকে সমানভাবে ভাগ করে পাকিস্তান ও ভারতকে দেওয়া হোক। সেই অনুসারে 1969 সালে আন্তর্জাতিক সীমারেখার


পুনর্বিন্যাস করা হয় এবং কচ্ছের রণ অঞ্চলের 9065 বর্গ কি.মি অঞ্চল পাকিস্থানকে দান করা হয়। পাকিস্থানের সঙ্গে ভারতের অন্য আর একটি অঞ্চল নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। তা হল ভারতের জম্মু কাশ্মীর ও পাকিস্তানের সীমানা অঞ্চল। কাশ্মীরের বেশ কিছু অঞ্চল পাকিস্থান দাবী করে এবং সেই অঞ্চল নিয়ে বারে বারে চলছে অসন্তোষ।


3. ভারত বাংলাদেশ সীমানা (Indo-Bangladesh Border): ভারত বাংলাদেশের সীমানার আয়তন 3,970 কি.মি এবং এর মধ্যে 2450 কি.মি. স্থলভাগের উপর দিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমানার ক্ষেত্রে প্রধান মতপার্থক্য শ্রীহট্ট, গারো, খাসিয়া এবং ভারতের জয়ন্তী পাহাড় অঞ্চল নিয়ে। কারণ এই অঞ্চলটি ঘন জঙ্গলপূর্ণ বলে এখানে সীমানারেখা টানার ক্ষেত্রে নানা অসুবিধা দেখা যায়। এর ফলে ভারতের দাবী অনুসারে Radcliff' লাইন-ই স্থির থাকে।বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা থাকার ফলে অনুপ্রবেশ সর্বদা চলে। এক্ষেত্রে কাঁটাতারের বেড়া দেবার ক্ষেত্রেও একটা মতবিরোধ দেখা যায়। তবে এই সকল মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক যথেষ্ট উন্নত রয়েছে এবং অনেকাংশে কাঁটা তারের বেড়া দেওয়া হয়েছে।

4. ভারত-মায়ানমার সীমানা (Indo-Mayanmar Border) : ভারত-মায়ানমার সীমানার প্রায় 870 কি.মি অঞ্চল জলবিভাজিকা অঞ্চলকে অনুসরণ করে গেছে এবং প্রায় তিনভাগের একভাগ অঞ্চল প্রবাহকে অনুসরণ করে গেছে এবং বাকী অঞ্চল প্রায় সরলরেখার সীমানা অনুসরণ করেছে। ভারত-মায়ানমার সীমানা সর্বদাই বন্ধুত্বপূর্ণ।


5. ভারত-নেপাল সীমান্ত (Indo-Nepal Border) : এই সীমারেখাটি 1858 সালে টানা হয় এবং এই সীমারেখা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কোন দ্বন্দ্বের অবকাশ নেই, যদিও নেপাল অতি সাম্প্রতিককালে ভারতের কিছু অংশ নিজেদের বলে দাবী করে ঐ দেশের মনেচিত্র নতুন করে অঙ্কন করেছে।


6. ভারত-ভুটান সীমান্ত (Indo-Bhutan Border) : ভারতের স্বাধীনতার বহু পূর্বে 1865 সালে Sanchula ভুটান ও গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে চুক্তির ভিত্তিতে এই সীমারেখা স্থির করা হয়। বর্তমানে ভারত ভুটানের সীমান্ত রক্ষা করে থাকে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Middle post ad 01